নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুসারে বন্দর কর্তৃপক্ষের বিনিয়োগের বিপরীতে আয় (আরওআই) ন্যূনতম ৪ শতাংশ না হলে সেক্ষেত্রে ইনসেনটিভ বোনাস নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদিও এ শর্তপূরণ না করেই ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মীরা ইনসেনটিভ বোনাস নিয়েছেন। শুধু মোংলা বন্দরই নয়; রাষ্ট্রায়ত্ত আরো অনেক প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও কর্তৃপক্ষ বছরের পর বছর ধরে লোকসানে থাকা এবং রাষ্ট্রের ভর্তুকি গ্রহণের পরও কর্মীদের অনৈতিকভাবে বিভিন্ন ধরনের বোনাস দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি থাকার কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলোয় এ ধরনের অনৈতিক চর্চা চলে আসছে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপণে ফরেনসিক অডিট করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে পরিচালন কার্যক্রম থেকে ২৪৫ কোটি টাকা আয় করে। পরিচালন ব্যয় বাদ দেয়ার পর ওই অর্থবছরে কর্তৃপক্ষের ১ কোটি টাকা পরিচালন লোকসান হয়। যদিও ব্যাংকে গচ্ছিত স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) সুদ বাবদ ৫৭ কোটি টাকা আয়ের সুবাদে সে অর্থবছরে ৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকার কর-পরবর্তী নিট মুনাফা দেখানো হয়। এভাবে লাভজনক দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা ৭ কোটি ১৩ লাখ টাকার ইনসেনটিভ বোনাস নিয়েছেন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও একইভাবে অপরিচালন খাতের আয় থেকে মুনাফা দেখিয়ে ইনসেনটিভ বোনাস নিয়েছেন মোংলা বন্দরের কর্মীরা।
তবে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মীদের এই ইনসেনটিভ বোনাস গ্রহণসহ আর্থিক প্রতিবেদনের বেশকিছু বিষয় নিয়ে আপত্তি জানান নিরীক্ষক, যদিও সেই আপত্তি ও মতামত কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে রাখা হয়নি। নিরীক্ষক আর্থিক প্রতিবেদনের বিষয়ে তার মতামতে বলেন, ‘২০২২-২৩ অর্থবছরে কর্তৃপক্ষের আয়ের বড় অংশই এসেছে অপরিচালন খাত থেকে। আইন অনুসারে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দেয়ার বিধান থাকলেও মোংলা বন্দর তা না করে এ অর্থ ব্যাংকে এফডিআর রেখে সেখান থেকে আয় করছে। ইনসেনটিভ বোনাসের ক্ষেত্রে অপরিচালন খাতের আয় বিবেচনা করা না হলে আলোচ্য অর্থবছরে ৩১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা কর-পরবর্তী নিট লোকসান হতো কর্তৃপক্ষের। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় অনুমোদিত ইনসেনটিভ পলিসি অনুসারে আরওআই ন্যূনতম ৪ শতাংশ না হলে ইনসেনটিভ বোনাস দেয়া যায় না।’ নিরীক্ষকের মতে, আলোচ্য অর্থবছরে মোংলা বন্দরের আরওআই ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ফলে আইনগতভাবেই কর্তৃপক্ষের কর্মীরা ইনসেনটিভ বোনাস পাওয়ার জন্য যোগ্য নন।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষার দায়িত্বে থাকা আলী জহির আশরাফ অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের পার্টনার শেখ আশাফুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মোংলা বন্দরের ২০২২-২৩ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনে বেশি মুনাফা দেখানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যয়ের তথ্য গোপন করা হয়েছে এবং কোনো ক্ষেত্রে ব্যয় প্রলম্বিত করা হয়েছে। আইন অনুসারে সরকারি কোষাগারে উদ্বৃত্ত অর্থ জমা না দিয়ে সে টাকা তারা ইকুইটি ফান্ড তৈরি করে সেখান থেকে বোনাস নিচ্ছে, খরচ করছে। নিয়ম অনুসারে তারা বোনাস পাওয়ার যোগ্য না হলেও অন্যান্যভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থ থেকে সুবিধা নিচ্ছে। এটি অ্যাকাউন্টিংয়ের দৃষ্টিতেও নীতিবিরুদ্ধ কাজ। আর্থিক প্রতিবেদনে যে মুনাফা দেখানো হচ্ছে সেটি তার প্রকৃত মুনাফা নয়। যদি পুরোপুরি অ্যাকাউন্টিংয়ের নীতি মেনে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়, তাহলে মোংলা বন্দরের লোকসান হবে। অথচ তারা মুনাফা দেখিয়ে সেখান থেকে বোনাস নিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের মূল কার্যক্রম ও পরিচালন কার্যক্রম থেকে প্রাপ্ত আয় থেকে যারা মুনাফা করতে পারে না কিংবা লাভজনক অবস্থানে নেই কিংবা যাদের সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নিয়ে চলতে হয়, এমন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ইনসেনটিভ বোনাস কিংবা ডব্লিউপিপিএফের (ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড) অর্থ নেয়ার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রায়ত্ত এসব প্রতিষ্ঠান যে মুনাফা দেখাচ্ছে এবং নিরীক্ষক সেটিকে সার্টিফাই করছেন, সেটি যথাযথভাবে করা হচ্ছে কিনা তা যাচাইয়ের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানকে পেশাদার নিরীক্ষকের মাধ্যমে ফরেনসিক অডিট করানো উচিত।’
জানতে চাইলে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (অর্থ) কাজী আবেদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যে সময়ের আর্থিক প্রতিবেদনের কথা বলা হচ্ছে, সে সময় আমি দায়িত্বে ছিলাম না। কিন্তু তার পরও বলতে পারি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের একটি প্রতিবেদন সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা হয় এবং সেখানে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য থাকবে সেটিই স্বাভাবিক। এর ব্যত্যয় হওয়ার সুযোগ নেই।’
তবে শুধু মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষই নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত আরো বেশকিছু সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশন লোকসানে থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন ধরনের বোনাস ও ডব্লিউপিপিএফ সুবিধা নিচ্ছে। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) ১৩টি কোম্পানির কর্মীরা গত পাঁচ বছরে ১ হাজার ২৪৭ কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের বোনাস নিয়েছেন। এর মধ্যে ৩৬৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকার উৎসাহ বোনাস, ১৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকার ইনসেনটিভ বোনাস ও ডব্লিউপিপিএফ খাতের ৭০৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা রয়েছে। এক্ষেত্রে ডব্লিউপিপিএফ খাতে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি সবচেয়ে বেশি ১৮২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা নিয়েছে। উৎসাহ বোনাস হিসেবে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস সবচেয়ে বেশি ৬৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। আর ইনসেনটিভ বোনাস হিসেবে সবচেয়ে বেশি ৪৬ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। তাছাড়া এ সময়ে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, বাপেক্স, জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম, বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি, পেট্রোবাংলা, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি, সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি ও মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি গত পাঁচ বছরে কর্মীদের বিভিন্ন ধরনের বোনাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে।
অর্থ বিভাগের সাবেক সচিব ও সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত ১৫ বছরে জবাবদিহির কাঠামো না থাকার ফলে সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল। পেশাদার কর্মীর মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করা হয় না। এমনকি এখানে যে পেশাদারত্বের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করা প্রয়োজন অনেক সময় সেটিও আমাদের আমলাতন্ত্রের মনস্তত্ত্বের মধ্যে কাজ করে না। এসব কারণে অনেক সময় মনগড়া আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। বহির্নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে যথাযথভাবে নিরীক্ষা করা হয় না। রাষ্ট্রায়ত্ত এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে আইনেই বলা আছে যে তারা নিজেরাই নিরীক্ষক নিয়োগ করবে। এটিও একটি বড় ধরনের স্বার্থগত সংঘাতের উদাহরণ।’
ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫০৫ কোটি টাকা কর-পরবর্তী নিট লোকসান করেছে। যদিও আলোচ্য অর্থবছরে কোম্পানিটি কর্মীদের ১২ কোটি ৮৯ লাখ টাকার ইনসেনটিভ বোনাস দিয়েছে। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩০২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা কর-পরবর্তী লোকসান করেছে। যদিও আলোচ্য অর্থবছরে ১২ কোটি ৯৮ লাখ টাকার ইনসেনটিভ বোনাস পেয়েছেন রাষ্ট্রায়ত্ত এ কোম্পানির কর্মীরা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭৪৪ কোটি টাকা কর-পরবর্তী নিট লোকসান হলেও তিতাস গ্যাস ৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ডব্লিউপিপিএফ খাতে ব্যয় করেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানই অ্যাকাউন্টিংয়ের মারপ্যাঁচ করে আর্থিক প্রতিবেদনে অনেক কিছু দেখায় না, গোপন রাখে, অনেক ব্যয়ের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা থাকে। সিএজির কার্যালয় থেকেও বিভিন্ন সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে প্রতিবেদন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেক দেরি করে এসব প্রতিবেদন দেয়ার কারণে সেগুলোর ভিত্তিতে এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তেমন কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। এর ফলে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্যের সঠিক চিত্র প্রতিফলিত হয় না। এতে সরকারেরও ব্যয় বাড়ে। তাছাড়া লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করে এগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কারও করা হয় না। এ জায়গাগুলোয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
রাষ্ট্রায়ত্ত এসব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক দেখিয়ে কর্মীদের বিভিন্ন ধরনের বোনাস দেয়া হলেও খোদ অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে ৭৯টি প্রতিষ্ঠান মাঝারি থেকে অতি উচ্চমাত্রার আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে বলে উঠে এসেছে। অর্থ বিভাগের মনিটরিং সেল ১০১টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার আর্থিক ঝুঁকির বিষয়টি মূল্যায়ন করেছে। এতে দেখা গেছে, ১৪টি প্রতিষ্ঠান অতি উচ্চমাত্রার আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাছাড়া ২৮টি উচ্চ ঝুঁকি ও ৩৭টি মাঝারি মাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে অতি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড, ঢাকা লেদার কোম্পানি লিমিটেড, শ্যামপুর সুগার মিল লিমিটেড, জয়পুরহাট সুগার মিল লিমিটেড, রাজশাহী সুগার মিল লিমিটেড, নাটোর সুগার মিল লিমিটেড, কুষ্টিয়া সুগার মিল লিমিটেড, মোবারকগঞ্জ সুগার মিল লিমিটেড, পাবনা সুগার মিল লিমিটেড, ফরিদপুর সুগার মিল লিমিটেড, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ও ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেড। তাছাড়া উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ১৩টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।